কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার গোমতী নদীর বাঁধ সংলগ্ন চর এলাকা থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের অভিযোগে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে মামলা দায়েরের পরও অভিযুক্তদের একটি সিন্ডিকেট বেপরোয়াভাবে মাটি কাটা অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনিক তৎপরতার দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হয়নি; বরং প্রভাব খাটিয়ে তা চলছেই।
পাউবো সূত্র জানায়, তাদের কুমিল্লা বিভাগের আওতাধীন আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবি ইউনিয়নের গোলাবাড়ি, শাহপুর, চানপুর ও সালধরসহ গোমতী নদীর বিভিন্ন চরের জায়গা থেকে দীর্ঘদিন ধরে রাতের অন্ধকারে এক্সকেভেটর ও ট্রাকের মাধ্যমে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। গত ১৭ ডিসেম্বর সরেজমিন পরিদর্শনে এ ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। পরে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ১৬ জনের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র নদীর চরের মাটি অস্বাভাবিক গভীর করে কেটে বিভিন্ন ইটভাটা ও ব্যক্তির কাছে বিক্রি করছে। এতে করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও বাঁধের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, তারা বাধা দিতে গেলে হুমকি-ধমকির শিকার হন। অনেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
মামলায় যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন গোলাবাড়ির মো. রিপন, ছাওয়ালপুরের আবুল খায়ের ও আবুল হোসেন, ঝারখন্ডোর মমিন মিয়া, শাহপুরের শামীম ও লিটন, চানপুরের খোরশেদ আলম (সুমন), শাহজাহান মিয়া, এনায়েত হোসেন ও মোর্শেদ, আমড়াতলীর শহীদ মিস্ত্রী, কালিকাপুরের মারুফ মিয়া, শ্রীপুর মাঝিগাছার আলম মিয়া, সংরাইশ সিটি কর্পোরেশনের শাহাদাত, শুভপুরের জুয়েল রানা এবং ছোটরার শামীম হকসহ আরও কয়েকজন। তাদের অধিকাংশই এক্সকেভেটর ও ট্রাক ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে মাটি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছে, গোমতী নদী একটি ফ্ল্যাশি প্রকৃতির নদী। উজানের ঢলে প্রতিবছর নদীতে পানির চাপ বেড়ে যায় এবং ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ অবস্থায় বাঁধসংলগ্ন চরের মাটি গভীর করে কেটে নেওয়া হলে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে করে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, অবৈধ মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে ১৬ জনের নামে থানায় মামলা করা হয়েছে। তিনি জানান, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অন্যদিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। যারা গোমতী নদীর চর থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটছে তাদের চিহ্নিত করে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, মামলা দায়েরের পরও যদি প্রকাশ্যে এক্সকেভেটর ও ট্রাক দিয়ে মাটি কাটা চলতে থাকে, তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা কোথায়? তাদের দাবি, দ্রুত অভিযান চালিয়ে মাটি কাটা বন্ধ ও জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হলে গোমতী বাঁধ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
স্থানীয়দের দাবী, নদী ও বাঁধ রক্ষায় কাগুজে পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কঠোর অভিযান। অন্যথায় পরিবেশ ও জননিরাপত্তা—দুটিই মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।
Leave a Reply