২০২৫ সাল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) এক বেদনার বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বছরজুড়ে তিনজন সম্ভাবনাময়, মেধাবী শিক্ষার্থীকে হারিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। শিক্ষা জগৎ হারিয়েছে তিনটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, আর তিনটি পরিবার ডুবে গেছে শোকে।
বছরের প্রথম দিকেই মৃত্যুবরণ করেন আইন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিন্নী আক্তার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফুসফুসজনিত রোগে ভুগছিলেন এবং চিকিৎসাধীন ছিলেন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। পাশাপাশি ব্লাড ইনফেকশনের জটিলতাও দেখা দেয়। গত ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বাসিন্দা তিন্নীর মৃত্যুতে পুরো আইন বিভাগ শোকাহত হয়ে আছে এখনো।
তার সহপাঠী নাদিয়া ইসলাম নাবিলা বলেন, তিন্নি আমাদের সেই নক্ষত্র যে দূর থেকেও সব সময় আমাদের হৃদয়ে সদা বিরাজমান। প্রতিটি ক্লাসে, পরীক্ষায়, আমাদের ব্যাচ এর অন্য যে কোনো প্রোগ্রামে-ওর শূন্যতা অপূরণীয়। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতে অতি যত্নে রাখেন।
এর কিছু মাস পর ৭ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুরি এলাকা নিজ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার ও তার মা তাহমিনা বেগমের মরদেহ। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। শান্ত স্বভাবের এই শিক্ষার্থী ও তার মায়ের আকস্মিক মৃত্যু বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমেছিল। সহপাঠীরা এখনো তার শোকে শোকাহত।
তার সহপাঠী মুনিয়া আফরোজ বলেন, “সুমাইয়ার চলে যাওয়া আর আমাদের দৈনন্দিন বা অ্যাকাডেমিক জীবনে আর প্রভাব না ফেলছেও হঠাৎ করে মনে হয় কেউ একজন নেই। একটা শান্ত স্নিগ্ধ মেয়ে কতশত অভিমান নিয়ে হঠাৎ করে হারিয়ে গেল। সময়ের সাথে সাথে মেনে এবং মানিয়ে নেই বলেই আমরা মানুষ। তবুও প্রতিটা ক্লাস শেষে অ্যাটেনডেন্স নেওয়ার সময় স্যারেরা যখন রোল নাম্বার ১ বলে উঠে, তখন ঠিক কতটা অসহায় লাগে তা কি আদৌও লিখে বুজানো সম্ভব? আমার পক্ষে সম্ভব না!”
বছরের শেষে মারা যান কুবির কমপিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষার্থী তাসমানিয়া রহমান প্রভা। চাঁদপুর জেলার বাগাদী এলাকার মেধাবী এই শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যানসারে ভুগছিলেন। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ১৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
কমপিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মাহমুদুল হাছান বলেন, “যে-কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যুই তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি। আমাদের একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে বিভাগ শোকাহত। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি, তারা যেন এ শোক সয়ে উঠতে পারে। শিক্ষার্থীরা দেশের সম্পদ, আর কোন শিক্ষার্থীকে আমরা হারাতে চাইনা।”
এক বছরের ব্যবধানে তিন তরুণ শিক্ষার্থীর মৃত্যু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক ক্ষতি। তিনটি স্বপ্নভঙ্গ, তিনটি অসম্পূর্ণ যাত্রা যা স্মরণে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি মানুষের মনে।
Leave a Reply